আওয়ামী লীগ-পুলিশ সংঘর্ষ

0
36

পাঁচ গুলিবিদ্ধসহ আহত ৩০ * কয়েকশ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দুই মামলা, গ্রেফতার ১৩ * প্রধান আসামি বরিশাল সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ
messenger sharing button

বরিশালে পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে পাঁচজন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। বুধবার রাতে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুনিবুর রহমানের সরকারি বাসভবনে হামলাকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহও আঘাতপ্রাপ্ত হন বলে তিনি দাবি করেছেন। আহতদের মধ্যে ৩ পুলিশ ও ২ আনসার সদস্য রয়েছেন।

ঘটনার প্রতিবাদে রাতেই নেতাকর্মীরা নগরীর রূপাতলী ও নথুল্লাবাদ টার্মিনাল এলাকায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে। একইসঙ্গে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বন্ধ করে দেয় অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লা রুটের লঞ্চ চলাচল। পরে প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা বৈঠক শেষে দুপুর ১২টার পর বাস-লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক হয়। এদিকে ইউএনওর বাসভবনে হামলার ঘটনায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকশ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়েছে। উভয় মামলায় বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদিক আব্দুল্লাহকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ১৩ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বরিশাল নগরীতে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন জানান, বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় কম্পাউন্ডে রাতে ব্যানার খুলতে যায় নগর ভবনের কর্মচারীরা। এ নিয়ে সেখানে ইউএনও মুনিবুর রহমানের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাসের কথা কাটাকাটি হয়। উপজেলা কমপ্লেক্সে ইউএনও’র নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন আনসার সদস্য জানান, একপর্যায়ে ব্যানার খোলার কথা বলে কম্পাউন্ডে ঢোকা ২৫-৩০ জন ইউএনও স্যারের বাসভবনে ঢুকে তাকে ঘিরে ফেলে। তাকে রক্ষায় এগিয়ে গেলে আনসারদের ওপর হামলা চালায় তারা। তখন আনসার সদস্যরা গুলি ছোড়ে। এতে ২-৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। খবর পেয়ে রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগর পরিষদের বেশ কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর গুলির খবর শুনে কয়েকশ নেতাকর্মীও জড়ো হয় সেখানে। তাদের নিয়ে মেয়র উপজেলা কমপ্লেক্সের ভেতরে ঢুকতে গেলে দ্বিতীয় দফায় ভেতর থেকে গুলি ছোড়ে আনসার সদস্যরা। এবারও ২-৩ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ভেতরে ঢুকতে না পেরে কমপ্লেক্সের বাইরে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে অবস্থান নেন মেয়র সাদিক। ছাত্রলীগ কর্মীরা এ সময় একটি বাস ভাঙচুর করে। পরে মেয়র ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। উপজেলা কমপ্লেক্সে এসব ঘটনা চলার মধ্যেই সেখানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পৌঁছায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ। বাস ভাঙচুরসহ সড়ক অবরোধ ঠেকাতে গেলে ছাত্রলীগ এবং যুবলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী ধাওয়া পাল্টাধাওয়া হয়। এতে পুলিশসহ ৩০ জন আহত হয়েছেন। একপর্যায়ে পিছু হটে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীরা। এরইমধ্যে নগর ভবনের বেশ কয়েকটি ময়লা ফেলার গাড়ি এনে এলোপাতাড়ি ফেলে রেখে অবরোধ করা হয় ঢাকা বরিশাল মহাসড়ক। স্তূপাকারে নাগরিক বর্জ্য ফেলা হয় মহাসড়কে। ফলে বন্ধ হয়ে যায় মহাসড়কে যানবাহন চলাচল।

গুলিবিদ্ধদের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা শাহরিয়ার বাবু, হারুন অর রশিদ ও তানভীর নামে তিনজনকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরে অবস্থার অবনতি হলে তানভীরকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিবুর রহমান বলেন, ‘রাত সাড়ে ১০টায় ৮-১০টি মোটরসাইকেলে ১৫-২০ জন আমার উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্সে ঢুকে ঘোরাফেরা করছিল। আমি তাদের এখানে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা জোর করে আমার ঘরে ঢুকে পড়ে। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রাজীব নামে এক ছাত্রলীগ নেতা। পরে আনসার সদস্যরা তাদেরকে বের করে দেয়। কিছুক্ষণ পর ৬০-৭০ যুবক হঠাৎ করে আমার বাসার ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং কয়েকজন দোতলায় উঠে আসে। আমি জানতে চাইলে তাদের একজন নিজেকে মাহমুদ হাসান বাবু এবং আরেকজন সাজ্জাদ সেরনিয়াবাত বলে জানায়। দুজনই নিজেদের আওয়ামী লীগ নেতা বলে পরিচয় দেয়। তারা আমাকে উঠিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় আনসার সদস্যরা আমার প্রাণ বাঁচায়। এরপর কয়েকশ লোক এসে কমপ্লেক্সে হামলা চালায়। তারা গেট ভেঙে ফেলাসহ অনেক ক্ষতি করেছে।’

রাত সাড়ে ৩টায় সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ তার বাসভবনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বরিশাল সিটি করপোরেশনের কর্মীরা সেখানে তাদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলেন। অথচ তাদের ওপর ন্যক্কারজনকভাবে গুলি চালানো হয়েছে। ঘটনা সম্পর্কে জানতে আমি সেখানে গেলে আমার ওপরও গুলি চালানো হয়েছে। আমার বহু নেতাকর্মী আহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই। বিচার চাই। এভাবে তো দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।’

কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি নুরুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। একটির বাদী বরিশাল সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মুনিবুর রহমান, অপরটির বাদী পুলিশ। দুই মামলায় ৯৪ নেতাকর্মীর নামোল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকশ জনকে আসামি করা হয়েছে। উভয় মামলায় প্রধান আসামি বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদিক আব্দুল্লাহ। এছাড়া আসামির তালিকায় রয়েছেন-২১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ সাইয়েদ আহম্মেদ মান্না, বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সাজ্জাদ সেরনিয়াবাত, আতিকুল্লাহ মুনিম, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, সাংগঠনিক সম্পাদক রাজীব হোসেন খান, মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিমল চন্দ্র দাস, মহানগর ছাত্রলীগ নেতা অনিক সেরনিয়াবাত, রইজ আহম্মেদ মান্না প্রমুখ। ইতোমধ্যে পুলিশ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ১৩ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতারদের মধ্যে রয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসান মাহমুদ বাবু, ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন ফিরোজ ও ছাত্রলীগের সহসভাপতি অলিউল্লাহ অলি।

এদিকে বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে নগরের কালিবাড়ি রোডে মেয়রের বাসভবন হঠাৎ করেই ঘিরে ফেলে র‌্যাব ও পুলিশের সদস্যরা। এ সময় সেখানে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন। মেয়রের বাসার ভেতরে নেতাকর্মীরা যেতে চাইলে তাতেও পুলিশ বাধা দেয়। তবে কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চলে যায়। এ বিষয়ে ওসি নুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছে তথ্য ছিল রাতের ঘটনায় জড়িতদের কেউ কেউ সেখানে অবস্থান করছিল। পরে অবশ্য কাউকে পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় ইউএনও মুনিবুর রহমানের প্রত্যাহার ও গ্রেফতার নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি জানিয়েছে জেলা ও মহানগর আ.লীগ। বিকালে মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। নেতারা বলেন, সেখানে গুলি ছোড়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এ নিয়ে তারা আইনি প্রক্রিয়ায় এগোনোর কথাও জানান। লিখিত বক্তব্যে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা গাজী নঈমুল হাসান লিটু বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর গুলি ছোড়ার নির্দেশ দিয়েছেন ইউএনও। এতে প্যানেল মেয়র-২ রফিকুল ইসলাম খোকনের শরীরে ৪০ থেকে ৪৫টি ছিদ্র হয়। আরও আহত হয় ৬০ জন। সংবাদ সম্মেলনে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ ফারুখ হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুসসহ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলররা উপস্থিত ছিলেন।

১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন : কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বরিশাল নগরীতে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। একইসঙ্গে মাঠে থাকবেন অতিরিক্ত ১০ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বৃহস্পতিবার দুপুরে বরিশাল জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ইউএনও’র বাসভবনে হামলার ঘটনার পর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বিজিবি ও অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট চাওয়া হয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে