মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৩৫ অপরাহ্ন

মেঘের পর মেঘ

অপু সুলতান | নরসিংদী জার্নাল / ৪৯৯ বার
আপডেট : শনিবার, ৩১ জুলাই, ২০২১
মেঘের_পর_মেঘ
মেঘের পর মেঘ || অপু সুলতান

প্রিয় গানের মিউজিকের মতই বৃষ্টির শব্দ শুনলে গভীর ভাবনায় বিভোর হয় নীলিমা। এই দুপুরে প্লেট ভর্তি ভাত টেবিলে রেখে এসে বারান্দায় ঠাই দাঁড়িয়ে আছে সে। কয়েকদিন যাবত অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। বাতাসে সোঁদা মাটির গন্ধ মিশে গেছে। মাঝে মাঝে রোদ এসে ঝলকানি দিচ্ছে। সদ্যস্নাত গাঢ় সবুজ ভেজা ঘাস, গাছের পাতা ও লতাগল্মগুলো রোদের আলোয় চিকচিক করছে। কয়েকটা ভেজা কাক জড়সড় হয়ে বারান্দার কাছে জাম গাছটায় বসে আছে।

কিছু শালিকও খাবারের সন্ধানে বের হয়েছে। নীলিমা আকাশের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে ভাবছে, ‘আকাশে যখন মেঘ করে তখন মেঘগুলোকে দূরবর্তী কোন পাহাড়শ্রেণীর মতো মনে হয়। পাহাড় তো স্থির দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু মেঘগুলো দ্রুত সড়ে সড়ে যায়। মেঘের পিছনে মেঘ দৌড়ায়, মেঘের আড়ালেও মেঘ থাকে। মেঘ এবং বৃষ্টির সাথে মানুষের মনেরও একটা নিবিড় সর্ম্পক আছে।’ আকাশে মেঘ করলে নীলিমা কেমন যেন ভাবনায় প্রচ্ছন্ন হয়ে যায়। সে ভাবনা প্রকৃতির মতই তার চেহারায় ছাপ ফেলে।

ভারি বর্ষন শুরু হয়েছে। সাথে ঝড়ো হাওয়া। নীলিমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টির ঝাপটায় শরীর ভিজে যাচ্ছে। এদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। বাসায় আজ সে একা। লাউড স্পীকারে রবী ঠাকুরের প্রিয় একটা গান কেবলই বেজে চলছে- “আজি ঝর ঝর মুখর বাদল দিনে জানি নে জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না”। কর্মহীন এই অলস বৃষ্টি ভেজা দুপুর নীলিমাকে হিড়হিড় করে টেনে অতীতে নিয়ে গেলো। নম্র-ভদ্র কিন্তু একরোখা ও লাজুক ছেলে শীতক।

বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি ফাইনাল এক্সাম শেষ করে বেড়াতে এসেছে মামার বাড়ি। সেখানেই এক বিকেলে পরিচয় নীলিমার সাথে। মায়া ভরা চোখ আর গোলগাল চেহারার অসাধারণ এক মেয়ে নীলিমা। বাবা মারা যাওয়ার পর নীলিমা ছোট খালার বাসায় থাকে।

ভালো ছাত্র হওয়ায় শীতক সুন্দরীদের থুরাই কেয়ার করে। কিন্তু নীলিমাকে দেখার পর শীতকের বুকের ভিতর কেমন যেন একটা উদ্ভূত অনুভূতি হচ্ছে। যেটা আজ অবধি সে কাউকে দেখে অনুভব করেনি। বাবা-চাচা, স্যার এমনকি বড় ভাইদের মুখেও শুনেছে ক্যারিয়ার গঠনের সময় মেয়েদের দিকে তাকাতে নেই। শীতকেরও একই ভাবনা। তার গণিতে মাথা ভালো, বিজ্ঞান বিষয়ও তার নখদর্পনে।

বিজ্ঞান বিষয়ে এতো পারদর্শীতা দেখে তার সহপাঠীরা অনেকে তাকে বিজ্ঞানগুরু বলে ডাকে। সেও স্বপ্ন দেখে বড় মাপের রিসার্চার হওয়ার। কিন্তু একি! কিছুতেই মাথা থেকে নীলিমা নামক ভূতটাকে সরাতে পারছেনা। ঘুমাতে যাওয়ার পর বিছানায়ও তাকে সেই একই ভাবনা ঘুমাতে দিলো না। রাতভর এপাশ ওপাশ করলো।

পরদিন ঘুম থেকে উঠেই সোজা নীলিমাদের বাড়ির সামনে। কিন্তু কিভাবে বাড়িতে ঢুকবে এই নিয়ে ভীষণ চিন্তায় আছে শীতক। মাথায় একটা বুদ্ধি আঁটলো। নীলিমা আর সে একই ক্লাসে পড়ে। সামনে ভার্সিটির এ্যাডমিশন। তো পড়ার জন্য একটা টেক্সট বই চাইতে গেল শীতক। তারপর কথা যা হলো তা মূলত পড়াশোনা নির্ভর। এর বাইরে কোনো কথা হয়নি।

আর একবার যাবার বাহানা স্বরুপ শীতক বলল, ‘বইটা বিকেলে দিয়ে যাবো।’ ‘ঠিক আছে’ বলে নীলিমা মাথা নাড়লো। বিকেলে শীতক নীলিমার সাথে বই নিয়ে আবার দেখা করতে যায়। এবার সে নীলিমার ফোন নাম্বারও নিয়ে আসে। তারপর, নীলিমা ভর্তি হলো ইডেন কলেজে। শীতক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুজনের দেখা হয়, কথা হয় রোজ। একদিন দু’জন মিলে সিনেমা দেখতে গেলো বলাকা হলে। হালের সবচেয়ে আলোচিত ছবি ‘মনপুরা’।

ছবির নায়িকা পরীর শেষ পরিণতি দেখে নীলিমা শীতকের হাত ধরে সেদিন জনমের কাঁন্না কেঁদেছিলো। যখন সোনাই জানতে পারে পরী মারা গেছে, সোনাই মাঝ নদীতে বৈঠা ফেলে দিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে নৌকায় ভাসছিল। তখন শীতকও নীলিমার হাত ধরে বলল, কথা দাও নিলীমা আমাকে কোনোদিন ভুলে যাবে না, ভুল বুঝবে না। নিলীমা বলল, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি শীতক, অনন্তকাল ভালোবাসবো।’

সময় যাচ্ছিলো বেশ। বাঁধ সাধে নীলিমার খালু। তিনি সস্ত্রীক হজে যাবেন। নিজের মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। এবার নীলিমাকে দিতে পারলেই তিনি বাঁচেন। বলা যায় নীলিমার বাবা মারা যাওয়ার পর তিনিই তাকে মানুষ করছেন। ভাবনা মোতাবেক সব ঠিক ঠাক। কিন্তু বেঁকে বসে নীলিমা। তবে এই বাঁকায় বেশি দূর আগাতে পারেনি সে। একেই তো বাবা নেই। তার উপর দেখভাল করেছেন খালু। তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া ত্যাগ করে বিয়ের পিড়িতে বসে নিলীমা। সেই কখন থেকেই নীলিমা অবিরাম বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে। চোখের জল আর বৃষ্টির জল মিশে একাকার। নীলিমা চিৎকার করে বলছে, ‘আমার আকাশে মেঘের পর মেঘ করে, কদাচিৎ বৃষ্টি হয়। কখনো সূর্য উঠে না। আমি তোমাকে ভুলে যাইনি শীতক, বিশ্বাস কর তোমাকে ভুলে যায়নি’ সেই চিৎকার বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের সাথে মিলিয়ে যায়, বেশি দূর যায় না। হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠে। লাঞ্চের সময়। হয়তো তার স্বামী এসেছে। তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে নীলিমা।

Facebook Comments Box


এ জাতীয় আরো সংবাদ

error: Content is protected !!
error: Content is protected !!